বাঙালী জীবনের কেন্দ্রীয়-পর্যায়ে স্বভাগা থাকবে না পরভাষ। থাকবে এ প্রশ্ন মীমাংসিত হয়ে গেছে। বাঙলা ভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ১৯৭২ সালে, আর ১৯৮৭ সালে দেওয়া হয়েছে আইনগত স্বীকৃতি। স্বীকৃতির সমস্যা ঢুকে গেলেও স্বীকরণের সমস্যা চুকে যায়নি। পরতামার সমস্যা মিটলেও পরিভাষার সমস্যা মিটে নি। ইদানীং অনেকেই সর্বস্তরে বাঙলা প্রচলনের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। ‘বাঙলা- প্রচলন-সমস্যা’র ‘আলোচকের। সচরাচর পরিভাষাকে বাঙল। প্রচলনের অন্তরার হিসেবে চিহ্নিত করতে উৎসাহিত হন। সবাই যে একইভাবে পরিভাষাকে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করেন তা নয়; কেউ-বা একে প্রধান সমস্যা বিবেচনা করেন, কেউবা বিবেচনা করেন অপ্রধান সমস্যা হিসেবে। উত্তর দলেরই বন্ধমূল ধারণা যে, পরিভাষা বাঙলা-ভাষা সর্বস্তরে প্রচলনের অন্যতম প্রতিবন্ধক। এই প্রবন্ধের বিষয় হলো-‘বাঙলা পরিভাষা কঠিন মনে হয় কেন?’-এই প্রশ্নের যুক্তি-নির্ভর মীমাংসা উত্থাপন করা। যে কাজ করতে হলে ‘পরিভাষা কী?’, ‘বাঙলা পরিভাষার বিশেষত্ব কী’, ‘কঠিন মনে হওয়ার’ অনুযোগটি কী-ভাবে আলোচনা করা যেতে পারে? ইত্যাদি বিষয় ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বুঝে নেওয়। প্রয়োজন।
বাঙলা পরিভাগ। কঠিন প্রতিভাত হয় কেন?-এই প্রশ্ন বাঙলাভাষার অবয়ব পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ভাগার কোনো রূপাবয়ব ভামীর কাছে গৃহীত হয়ে কি হবেনা সেটা ভাঘার সমাজ-মনস্তত্ত্বের মধ্যে নিহিত। সুতরাং প্রশ্নটির মীমাংসা খুঁজতে গেলে ভাষার সমাজ-মনস্তত্বের দিকে উ’কি দিতে হবে। আমরা এদিকে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি।
বাঙলা পরিভাষার কঠিনতার কথা আলোচনার আগে তাঘায় পরিভাষা বলতে কোন্ ধরনের শব্দকে ইঙ্গিত করা হয় তা স্বচ্ছ করে নেওয়া আবশ্যিক।
প্রতিটি ভাষায় অজস্র শব্দ থাকে। কোনে। শব্দ প্রাত্যহিক, কোন শব্দ সাহিত্যিক, কোনো শব্দ প্রচলিত, কোনে। শব্দ অচলিত, কোনে। শব্দ স্বকৃত, কোনো শব্দ স্বাণকৃত। পরিভাষাও এক ধরণের শব্দ। তবে পারিভাষিক শব্দের সঙ্গে অপারিভাষিক শব্দের পার্থক্য আছে, সে পার্থক্য শব্দের অবয়বে নয়, অর্থে বা অর্থের বিশেষত্বে। যে-কোনে। জ্ঞানগর্ভ আলোচনার কতক- গুলো শব্দ প্রাধান্য লাভ করে, পৌনপুনিকভাবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ মানুষের গভীরতর চিন্তার ক্ষেত্রে কতকগুলো ধারণা বিশেষ তাৎপর্য ও সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মনে করা যাক, আমরা কম্পিউটার বিষয়ক আলোচনায় ব্যাপৃত আছি। আমাদের আলোচনার গন্ডীব মধ্যে স্বাভাবিকভাবে সফট- ওয়্যার, হার্ডওয়্যার, প্রোগ্রামিং, ডিজাইন, বকসোলজী, মন্টিকার্লো পদ্ধতি, সিমপসন সূত্র, লিনিয়ার মডেল, রো, কলাম, অর্ডার, কমাও, লগ, ম্যাট্রিক্স, আইল্যান্ড, প্যাকেজ, কনসট্রেইন্ট, লুপ, ট্রি, বিং, স্টার, ডাটা, গার্বেজ ইত্যাদি আরে। বহু শব্দ এসে যেতে পারে। এ-সব শব্দ কম্পিউটার বিজ্ঞানের তাৎপর্যমর ধারণা হিসেবেই আলোচনায় প্রাধান্য বিস্তার করবে। ধারণাগুলে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ধারণারাশির প্রধান অংশ। ধারণাগুলোর জন্য যে সকল শব্দ ব্যবহৃত, তাদের বলা যাবে কম্পিউটার বিজ্ঞানের পরিভাষা বা কম্পিউটার বিজ্ঞানের পরিভাষিক শব্দ।
মনে করা যাক, আমর। ভাষাবিজ্ঞানের কথা আলোচন। করছি। ভাষাতত্ত্বের আলোচনার মূলধ্বনি, সহধ্বনি, মূলরূপ, সহরূপমূল, শব্দক্রম, রূপান্তর, প্রস্বর, স্বরভঙ্গী, গ্রীমের সূত্র, ভারনারের সূত্র, প্রতিবেশ, পরিপূরক অবস্থান, দ্বিবাচন, সুভাষণ আরো বহু শব্দ বিশেষভাবে ব্যবহার করি। এ শব্দগুলোর অর্থের সঙ্গে পরিচয় না থাকলে বিষয়ালোচন। জ্ঞানতত্ত্বের মর্যাদালাভ করবে না।
কিংবা আমরা যদি রসশাস্ত্রের আলোচনার প্রবৃত্ত হই, তবে রস, সহৃদয়-হৃদয়সংবাদী, ফোটবাদ, ব্যঞ্জনা, ভাব, বিভাব, অনুভাব, ভাব-বিমোক্ষণ বা ক্যাথারসিস ইত্যাদি ধারণা প্ররোগ করব। সহজ কথায় চিন্তাধারার ক্ষেত্রে যেগুলো ধারণা হিসেবে চিহ্নিত হয় সেগুলো ভাষার ক্ষেত্রে পরিচিহ্নিত হয় পরিভাষা হিসেবে। অর্থাৎ যেকোন আলোচ্য জ্ঞানক্ষেত্রের তাৎপর্যপূর্ণ ধারণাগুলোর ভাষিক অবয়বকে (Language Corpus) সাধারণত পারিভাষিক শব্দ বা পরিভাষা বলা হয়।
বঙ্গভাষার অন্যতম অভিধানকার রাজশেখর বসু পরিভাষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “পরিভাষ। হচ্ছে সংকেপার্থ শব্দ। অর্থাৎ যে শব্দের দ্বারা সংক্ষেপে কোনও বিষয় সুনিদিষ্টভাবে ব্যক্ত করা যায় তা পরিভাষা। যে শব্দের অনেক অর্থ, যে শব্দও যদি প্রসঙ্গবিশেষে নির্দিষ্ট অর্থে প্রযুক্ত হয় তবে তা পরিভাষা-স্থানীয়। সাধারণত ‘পরিভাষা’ বললে এমন শব্দ বা শব্দাবলী বোঝার যার অর্থ পণ্ডিতগণের সম্মতিতে স্থিরীকৃত হয়েছে এবং যা দর্শন বিজ্ঞানাদির আলোচনার প্রয়োগ করলে অর্থবোধে সংশয় ঘটে না।” (রাজশেখর বসু, ১৩৪০)। প্রাচীন ভারতীর আলংকারিকের। শব্দের তিন বয়নের অর্থের কথা। উল্লেখ করেছেন। অর্থ ঠিক বলেন নি, বলেছেন শব্দের শক্তি। সেই তিনশক্তি হচ্ছে, অভিধাশক্তি, লক্ষণাশক্তি, আর ব্যঞ্জনাশক্তি। তিনশক্তির মধ্যে অভিধাই হচ্ছে পরিভাথার শক্তি। শব্দের যে শক্তিতে তার মুখ্যার্থ বা বাচ্যার্থ প্রতীত হয় অর্থাৎ শব্দের উচ্চারণমাত্রেই তার কোষ- ব্যাকরণাদি প্রসিদ্ধ অনারাসলত্য সহজ মুখ্য অর্থের বোধ হয় তাই অভিধা শক্তি। আধুনিক পরিভাষায় বল। যার শব্দের প্রতিবেশ-নিরপেক্ষ প্রধান ও অনন্য অর্থকে অভিবা বলা যায়। পারিভাষিক শব্দ, অন্য কথায় পরিভাষার অভিধা আছে, তাদের লক্ষণ। ও ব্যঞ্জনার বালাই নেই।